অন্যান্য
বাংলাদেশে মুরগী পালন একটি ক্রমবর্ধমান ও লাভজনক ব্যাবসা কিন্তু উষ্ণ ও আদ্র আবহাওয়াতে মুরগী পালন খুবই ঝুঁকিপূর্ন। বিশ্বব্যাপী মুরগী উৎপাদনকারীদের জন্য হিট স্ট্রেস একটি সাধারণ সমস্যা। মুরগী পারিপার্শ্বিক তাপমাত্রা পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং ইহাদের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা সীমিত। প্রচন্ড তাপের ফলে (হিট স্ট্রেস) মুরগীতে বিভিন্ন ধরণের শারীরবৃত্তীয় এবং আচরণগত সমস্যার সৃষ্টি হয়, উৎপাদন হ্রাস পায় যা খামারীর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ।
হিট স্ট্রেস কি?
মুরগী হোমোথার্মিক জীব এবং দৈহিক (গড় ৪০.০৬ক্কঈ) তাপমাত্রা বজায় রাখার জন্য পরিবেশের তাপমাত্রার উপরে নির্ভরশীল। যখন মুরগীর শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক এর চেয়ে বেড়ে যায় এবং মুরগী এই অতিরিক্ত তাপ কার্যকরভাবে হ্রাস করে ভারসাম্য রক্ষা করতে ব্যর্থ হয় তখন তাকে হিট স্ট্রেস বলে। এটি সকল বয়সের ক্ষেত্রেই ঘটতে পারে। পরিবেশের তাপমাত্রা ৩০ক্কঈ বেশি হলেই তা মুরগীতে হিট স্ট্রেস সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট বলে মনে করা হয় এবং এর সাথে যদি উচ্চ আর্দ্রতা যুক্ত হয় তখন পরিস্থিতি আরও চরম আকার ধারণ করে। অন্যান্য প্রাণীর মতো, মুরগীর দেহে তাপ হ্রাসে সাহায্য করার জন্য ঘর্ম গ্রন্থি থাকে না। স্বাভাবিক অবস্থায়, মুরগী মূলত বিকিরণ, পরিচলন এবং পরিবহনের মাধ্যমে তাপ হ্রাস করে দেহের সাম্যবস্থা রক্ষা করে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে সাথে মুরগী তাপ হ্রাসের জন্য বাষ্পীভবন পদ্ধতির (চধহঃরহম) এর আশ্রয় নেয়।
হিট স্ট্রোকের লক্ষণ-সমূহ
অতিরিক্ত গরমে হিট স্ট্রোক করে মুরগী মারা যাওয়ার প্রাক্কালে কিছু লক্ষণ পরিলক্ষিত হয়। তা হলো-
হিট স্ট্রেস এর কারণ সমুহ
পরিবেশগত কারণ যেমন সূর্যালোক, তাপীয় বিকিরণ, বায়ুর তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এবং স্টকিং ডেনসিটি। এছাড়াও মুরগীর শরীরের ওজন, দেহে পালকের আবরণ ও এর বিস্তার, হাইড্রেশন, বিপাকের হার এবং তাপ নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়া (Thermoregualtion) যথাযথভাবে কাজ না করলে হিট স্ট্রেস দেখা দেয়।
হিট স্ট্রেস এর প্রভাবসমুহ
১। খাদ্য গ্রহণের হার, দৈহিক বৃদ্ধি হ্রাস ও উৎপাদন হ্রাস
যখন তাপমাত্রা স্বাভাবিক এর চেয়ে বেশি হয়ে যায়, তখন মুরগী তাপ উৎপাদন কমানোর উদ্দেশ্যে খাওয়া কমিয়ে দেয়। যার ফলে দৈহিক বৃদ্ধি (ঋরম-১), ডিম উৎপাদন হ্রাস পায় এবং অপরদিকে খাদ্য রুপান্তরের হার (ঋঈজ) বৃদ্ধি পায়।

২। অন্ত্রের গাঠনিক পরিবর্তন
হিট স্ট্রেস অন্ত্রের ওজন, দৈর্ঘ্য, ব্যারিয়ার ফাংশন এবং মাইক্রোবায়োটাকে প্রভাবিত করা ছাড়াও ক্ষুদ্রান্ত্রের ভিলাই, জেজুনাম ও ডিওডেনামকে ছোট করে ফেলে (ঋরম-২) ফলে অন্ত্রের শোষণ ক্ষমতা কমে যায়।

৩। অক্সিডেটিভ স্ট্রেস
হিট স্ট্রেস এর ফলে কোষীয় শক্তির চাহিদা বৃদ্ধি পায়, যা মাইটোকন্ড্রিয়ায় জঙঝ তৈরীর হার বাড়িয়ে দেয় ফলে মুরগী অক্সিডেটিভ স্ট্রেস এ পড়ে।
৪। প্যান্টিং (হা করে শ্বাস নেওয়া)
মুরগী অতিরিক্ত প্যান্টিং করে করে, যার ফলে দেহে কার্বন ডাই অক্সাইড কমে যায় এবং রক্তের ঢ়ঐ এর ভারসাম্যহীনতা দেখা দেয় (জবংঢ়রৎধঃড়ৎু অষশধষড়ংরং)।
৫। পানিশুন্যতা
হিট স্ট্রেস এর ফলে মুরগীর দেহে পানিশুন্যতা দেখা দেয়। দীর্ঘমেয়াদে পানিশুন্যতার ফলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহের কার্যকারীতা বন্ধ হয়ে যায় ও মৃত্যুর হার বেড়ে যায়।
৬। মৃত্যুর হার বৃদ্ধি ও ফ্লক ইউনিফরমিটি কমে যাওয়া
অতিরিক্ত তাপের ফলে, মুরগী হঠাৎ করেই হিট স্ট্রোক করে মারা যেতে পারে। যারা বেঁচে থাকে তাদের দৈহিক বৃদ্ধি হ্রাস পায় যার ফলে ফ্লক সাইজে ভ্যারিয়েশন হয় এবং মুরগীর মার্কেট ভ্যালু কমিয়ে দেয়।
৭। মাংসের গুনগত মান হ্রাস ও অতিরিক্ত চর্বি জমা
হিট স্ট্রেস এ আক্রান্ত মুরগীর মধ্যে এনার্জিকে মাংস বৃদ্ধির জন্যে ব্যবহার না করে সেটাকে চর্বিতে রূপান্তরের প্রবণতা দেখা যায়। এই কারণে, মাংস বিবর্ণ, নরম ও এক্সুডেটিভ হয় যা ক্রেতা কিনতে আগ্রহ দেখায় না।
৮। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস ও রোগের প্রাদূর্ভাব বৃদ্ধি
অতিরিক্ত তাপমাত্রা ইমিউন সিস্টেমের কার্যকারীতাকে ব্যাহত করে, যার ফলে মুরগীতে বিভিন্ন ধরণের রোগ, যেমন- রাণীক্ষেত, ব্রংকাইটিস ও মাইকোটক্সিকোসিস এর প্রাদূর্ভাব বৃদ্ধি পায়।
মুরগীর হিট স্ট্রেস প্রতিরোধ ও প্রতিকারে খামারীদের করণীয়
১। মুরগীর ঘর ব্যবস্থাপনা
ক্স ভেন্টিলেশন (বায়ূপ্রবাহ) ঃ মুরগীকে হিট স্ট্রেস মুক্ত রাখার জন্য বায়ুচলাচল বা বায়ু প্রবাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফ্লকের সাইজ অনুযায়ী পর্যাপ্ত বায়ূপ্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে এজন্য প্রাকৃতিক বায়ূপ্রবাহ ছাড়াও এগজোস্টার ফ্যান ও ঠান্ডা এয়ার ইনলেট ব্যবহার করতে হবে। বাইরের তাপমাত্রা অনেক বেশি হলেও ফ্লকে মুরগীর জন্য উপযুক্ত তাপমাত্রার ব্যবস্থা করা জরুরি। এক্ষেত্রে অতিরিক্ত পরিমাণে ফ্যানের ব্যবস্থা করতে হবে এবং ভিতরের গরম বাইরে বের করার জন্য এগজোস্টার ফ্যান ব্যবহার করতে হবে। সিলিং ফ্যান ব্যবহারের চেয়ে স্ট্যান্ড ফ্যান ব্যবহার করা উত্তম। সূর্যের আলো যেন ঘরে সরাসরি প্রবেশ করতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পর্দা সম্পূর্ণরূপে খুলে রাখতে হবে। যে পাশে রোদ যাবে সেদিকে পর্দা টেনে লম্বা করে বারান্দার মতো করে রাখতে হবে কিন্তু নামিয়ে রেখে রোদ ঠেকানো যাবে না।
২। খাদ্য ব্যবস্থাপনা
৩। পানি ব্যাবস্থাপনা
৪। স্টকিং ডেনসিটি ও বার্ড হ্যান্ডলিং
হিট স্ট্রেস পরবর্তী সময়ে খামারে মুরগীর ব্যবস্থাপনা
হিট স্ট্রেস মোকাবেলায় ফার্মের ব্যবস্থাপনা ভালো হলেও অনেক সময় কিছু মুরগী হিট স্ট্রেস এ আক্রান্ত হতে পারে। তবে, তাৎক্ষনিক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে মুরগীর জীবন বাঁচানো ও উৎপাদন হ্রাস প্রতিরোধ করা সম্ভব। নিচে পদক্ষেপগুলো আলোচনা করা হলোঃ
১। জরুরী শীতলীকরণ ব্যবস্থা
২। হাইড্রেশন থেরাপী
৩। খাদ্য সমন্বয়
৪। রোগের পর্যবেক্ষন ও আরোগ্য লাভে সহায়তা
অতিরিক্ত তাপ ও চাপ মুরগী পালনের ক্ষেত্রে প্রকৃতির বিরুদ্ধে একটা যুদ্ধ। কিন্তু, সঠিক পদক্ষেপ ও প্রতিরক্ষামূলক ব্যাবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে খামারীরা সহজেই এই যুদ্ধ জয় করতে পারে। বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে তাই মুরগী পালন করতে হলে অবশ্যই খামারীদের জলবায়ূ-সচেতন হতে হবে এবং সে অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ নেবার প্রস্তুতি রাখতে হবে।
ডা: সালমান শাহরিয়ার
জেনারেল এগ্রো-কেয়ার লি.
ঢাকা।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ঢাকা টেলিগ্রাফ এর দায়ভার নেবে না।