অন্যান্য
আমাদের সমাজে বিষণতা, অ্যাংজাইটি, বাইপোলার মুড ডিজঅর্ডার, সিজোফ্রেনিয়া, সাইকোসিস ডিজঅর্ডার, ওসিডি, হেল্থ অ্যাংজাইটি, পোস্ট ট্রমাটিক ট্রেস ডিজঅর্ডার, প্যানিক অ্যাটাক, ফোবিয়া, কনভারশন ডিজঅর্ডার, পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার, প্রেমে প্রত্যাখ্যাত উন্মাদ আজ লক্ষ লক্ষ। এ সকল মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যাক্তিদের আমরা প্রতিনিয়তই দেখছি এবং আমরা তাদের সঙ্গে একই পরিবারে বা সমাজে বসবাস করছি। এ সকল অসুখে কীভাবে আমরা আক্রান্ত হই এবং এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? সে বিষয় নিয়ে আজকের আলোচনা।
মানসিক রোগ যেভাবে সৃষ্টি হয়
মানুষের মনে যে সকল স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা উদয় হয়, তাদের যথাযথ পূরণ না হওয়ায় সেই আকাঙ্ক্ষা মনে দমন হয়। এই দমন কোনো মহত্তর পথে আত্মপ্রকাশ না ঘটলে শেষ পর্যন্ত মানসিক বিকৃতি হয়ে মানসিক রোগ সৃষ্টি হয়। অর্থাৎ মনের সু ও কু উভয়বিধ পরিণতির মূলেই আছে এক বা একাধিক অবদমিত আকাঙ্ক্ষা। পরিবার, সমাজ, আইন, ধর্ম প্রভৃতি নানা শাসনের মধ্য দিয়ে আমাদের জীবন প্রবাহিত। সুতরাং আকাঙ্ক্ষা দমন করার প্রয়োজন হয় না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া যায় না। এই দমন শিল্পীর ক্ষেত্রে চিত্রের মধ্য দিয়ে, কবির ক্ষেত্রে কাব্যের মধ্য দিয়ে, সাধকের ক্ষেত্রে সাধনার মধ্য দিয়ে, কর্মীর ক্ষেত্রে কর্মের মধ্য দিয়ে প্রেমিকের ক্ষেত্রে প্রেমের মধ্য দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে। জীবনে যা মিলল না, বাস্তবে যা সফল হলো না, যা সংঘটিত হলো না, কল্পনার ভিতর দিয়ে তাকে সত্য, সম্ভব বা উপভোগ্য করার প্রবৃত্তি জন্মায়। এটাই হলো অবদমিত বাসনার দিবারূপ।
আবার এই বঞ্চনা বা ব্যর্থতাকে ডুবিয়ে রাখার জন্য কুক্রিয়া করা, খারাপ পথের অনুসরণ করা, অনৈসর্গিক আদর্শের পেছনে ছুটা প্রভৃতি হতে জন্মায় অপরাধ প্রবণতা, এটাই হলো অবদমিত ইচ্ছাশক্তির পূূূূূূর্ণরূপ। এই দুই রূপেই অবদমিত বাসনাসমূহ প্রকাশমান হয় এবং মানুষের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম কীর্তি ও জঘন্যতম কুকীর্তি দু’য়েরই মূল নিবন্ধই থাকে এই একটি জায়গায়। এই স্থানটিই হচ্ছে মানব মনের অবচেতন লোক। জীবনে যে সমস্ত কামনা স্ফূর্তি পায় না, সফল হয় না, সেগুলো পোষকতার অভাবে নিষ্প্রাণ হয়ে যায় বটে, কিন্তু নিঃশেষ হয় না। তারাই গিয়ে ঐ মন চৈতন্যের মধ্যে বাসা বাঁধে। তারপর শিক্ষা, সংস্কার পারিপার্শ্বিক প্রভাব ও জৈবিক ক্রিয়া অনুসারে সেগুলো মানুষকে ভালো বা মন্দের দিকে চালিত করে। এভাইে মানসিক রোগের সৃষ্টি।
চিকিৎসা
মানসিক রোগীর চিকিৎসার একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয় হলো- মনের অভ্যন্তরে যে সকল ভাবধারা উদয় ও অস্ত যায়, সেই সকল ভাব তরঙ্গের বিশ্লেষণই মানসিক রোগী চিকিৎসার প্রকৃষ্ট পন্থা। যেমন: মানুষের মনের মধ্যে এমন অনেক অংশ আছে যেগুলো অন্যান্য অংশের সহিত সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যবিহীন। এই সকল বিচ্ছিন্ন অংশাবলী অনেক সময় পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনে প্রয়াসী হয়। কিন্তু ঐ বিষয়ে স্বতঃই বাধা উৎপন্ন হতে পারে। সেই বাধাসমূহ না থাকলে মানুষ তার মনের গুপ্ত অংশের সঞ্চিত ব্যাপারসমূহ সবই জানতে পারতো, কিন্তু এই বাধাসমূহের জন্য তা জানা সম্ভব হয় না। আমরা যে হিস্টিরিয়ার লক্ষণ দেখি তা রোগীর শৈশবে সৃষ্ট দমিত মানসিক অবস্থার নাম। এই ঘটনাগুলো পরবর্তীতে অন্যান্য ঘটনার সংযোগে পুনরায় যখন সচেতন মনের মধ্যে আসে তখনই হিস্টিরিয়ার লক্ষণ প্রকাশ পায়। কিন্তু প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে কি স্বাভাবিক মনোবৃত্তিসম্পন্ন মানুষ নেই? উত্তর হচ্ছে অদর্শ বা স্বাভাবিক মানুষ বলতে যা বোঝায়, সেরূপ মানুষ দুর্লভ। প্রত্যেক মানুষেরই বাইরের বাধা-নিষেধের ফলে স্বতঃস্ফূর্ত আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ঘটে না তবে, এই অপূর্ণ ইচ্ছাশক্তিগুলোকে পূরণ করতে পারলে বা তাদের যথাযথ আত্ম-প্রকাশের পথ দেখাতে পারলে মানসিক রোগ সৃষ্টি হয় না।
মানসিক রোগ এবং শারীরিক রোগ একে-অন্যের পরিপূরক। মানসিক রোগ চিকিৎসার সময় দেহের ও মনের সকল লক্ষণসমূহ যত্ন সহকারে সংগ্রহ করতে হবে। মানসিক রোগীর চিকিৎসায় রোগীর পূর্বাপর সকল ঘটনা ভালো করে জেনে নিতে হবে। লক্ষণ সংগ্রহের সময় অবশ্যই জেনে নিতে হবে যে, এই রোগ হঠাৎ ভয় পেয়ে বা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে অথবা কোনো নেশাদ্রব্য সেবন করে হয়েছে কি না। রোগী চিকিৎসার সময়ে বুঝতে হবে এই রোগের তিব্রতা কেমন। যদি তিব্রতা বেশি থাকে তাহলে তীব্রতা কমিয়ে মূল চিকিৎসা শুরু করতে হবে।
কুশিক্ষাজনিত মানসিক ব্যাধি কাউন্সিলিং বা সাইকোথেরাপির মাধ্যমে অর্থাৎ বন্ধুভাবে অনুরোধ, প্রতিবাদ, উপদেশাদির দ্বারা প্রশমিত বা সংশোধিত হয়ে যায়। তবে, যে সকল মানসিক রোগ অন্যরোগ চিকিৎসার থেকে চাপা পড়ে সৃষ্টি হয় অথবা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার থেকে অথবা জেনেটিক্যালি অথবা দীর্ঘদিনের জমানো মানসিক চাপ থেকে সৃষ্টি হয় এবং রোগী স্বজ্ঞানে থাকে না তাকে অবশ্যই ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করতে হবে এবং পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আহারের উপরও গুরুত্ব দিতে হবে। রোগীর মন যখন বিষাদময় থাকে তখন সে কোনো স্বাস্থ্যকর চিত্তবিনোদন, শিক্ষার উপর কথোপকথন, জ্ঞানগর্ভ আলোচনা কোনোকিছুই তাকে শান্তি দেয় না। কারণ, বিষাদময় মন কোনো আমোদ-প্রমোদ উপভোগ করে না। যখন তার মানসিক ও শারীরিক লক্ষণসমূহের উন্নতি হতে থাকবে তখন এ সকল বিষয়সমূহ তাকে প্রভাবিত করবে।
একজন মানসিক রোগীকে চিকিৎসার সময় যে সকল পরিস্থিতিতে রোগী স্বজ্ঞানে থাকে সে সকল রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ, পথ্য ও কাউন্সিলিং করতে হবে এবং যে সকল রোগী স্বজ্ঞানে থাকে না সে সকল রোগীর শুধুমাত্র প্রয়োজনীয় ওষুধ ও পথ্যের ব্যবস্থা করতে হবে। রোগী স্বজ্ঞানে থাক বা না থাক উভয়ক্ষেত্রেই রোগীকে সূক্ষ্মমাত্রার ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হবে। চিকিৎসা চলাকালীন রোগীর কথায় কোনো প্রতিবাদ করা যাবে না। কোন ক্রুদ্ধভাব দেখানো যাবে না। বিরক্তি প্রকাশ করা যাবে না। কটূক্তি করা যাবে না। রোগীকে ভয় দেখানো, কোনো দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে চাপে ফেলা, তিরস্কার করা, ছলনা করা, প্রতারণার আশ্রয় নেয়া, দুর্বলভাবে নতিস্বীকার করানো, অস্বস্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি করা, ধমক দেয়া বা অনৈতিকভাবে প্রভাবিত করা যাবে না। এর কোনো একটি ঘটলে চিকিৎসায় হিতে বিপরীত হওয়ার সম্ভাবনায় বেশি। এছাড়াও রোগীর পক্ষে অশান্তিকর পরিবেশ দূর করার জন্য রোগীর অবিভাবকদেরকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান, সম্ভব হলে রোগীর বসবাসের স্থান পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদান এবং রোগীর অস্বস্তিকর এবং অশান্তিকর সমস্ত বাহ্যিক প্রভাব মুক্ত করতে হবে। সর্বোপরি চিকিৎসককে এমনভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে যে, রোগী চিকিৎসককেই সবচেয়ে নিরাপদ এবং শুভাকাংক্ষী মনে করে।
চিকিৎসক ও গবেষক (ক্রণিক ডিজিজ অ্যান্ড নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার)
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ঢাকা টেলিগ্রাফ এর দায়ভার নেবে না।