অন্যান্য
বরকত- মুসলিম সমাজে বহুল প্রচলিত একটি শব্দ। এর ভাবার্থ সম্পর্কে মুমিন-মুসলমান মাত্রই অবগত। তবে শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। পবিত্র কোরআন-হাদিসে বহুবার বরকত শব্দটি প্রয়োগ করা হয়েছে। তাফসির ও হাদিস বিশারদরা বিভিন্ন জায়গায় ‘বরকত’ শব্দটি বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। আল্লামা রাগিব ইস্পাহানি (রহ.)-এর মতে, ‘বরকত বলা হয় কোনো জিনিসে আল্লাহর কল্যাণ নিহিত থাকা।’ যেমন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর এটি বরকতময় কিতাব (কল্যাণময় কিতাব), যা আমরা নাজিল করেছি, যা তার আগের সব কিতাবের সত্যায়নকারী।’ সুরা আনআম : ৯২
ইমাম বাগভি (রহ.)-এর মতে, ‘বরকত’ এর শাব্দিক অর্থ প্রবৃদ্ধি। আর বরকতের মূল হচ্ছে, কোনো কিছু নিয়মিত থাকা। যেমন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যদি সেসব জনপদের অধিবাসীরা ইমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তবে অবশ্যই আমরা তাদের জন্য আসমান ও জমিনের বরকতগুলো উন্মুক্ত করে দিতাম, কিন্তু তারা মিথ্যা রোপ করেছিল; কাজেই আমরা তাদের কৃতকর্মের জন্য তাদের পাকড়াও করেছি।’ সুরা আরাফ : ৯৬
উপরোক্ত আয়াতে ‘আসমান ও জমিনের সব বরকত খুলে দেওয়া’ মানে সব রকম কল্যাণ সব দিক থেকে খুলে দেওয়া। অর্থাৎ তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী সঠিক সময়ে আসমান থেকে বৃষ্টি বর্ষিত হতো আর জমিন থেকে যেকোনো বস্তু তাদের মনমতো উৎপাদিত হতো অতঃপর সেসব বস্তু দ্বারা তাদের লাভবান হওয়ার এবং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করে দেওয়া হতো। ফাতহুল কাদির
‘বরকত’ শব্দ দ্বারা কখনো কখনো নেক সন্তান-সন্ততির প্রবৃদ্ধিও বোঝানো হয়। যেমন পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি ইবরাহিমের ওপর বরকত দান করেছিলাম এবং ইসহাকের ওপরও; তাদের উভয়ের বংশধরদের মধ্যে কিছুসংখ্যক সৎকর্মপরায়ণ এবং কিছুসংখ্যক নিজেদের প্রতি স্পষ্ট অত্যাচারী।’ সুরা সাফফাত : ১১৩
অর্থাৎ তাদের উভয়ের বংশ বিস্তার করেছিলাম। বেশির ভাগ নবী ও রাসুলের আগমন তাদের বংশ থেকেই ঘটেছে।
বরকতের আরও বহু অর্থ হতে পারে। যা বোঝার জন্য পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটির তাফসির দেখা যেতে পারে। ইরশাদ হয়েছে, ‘যেখানেই আমি থাকি না কেন তিনি আমাকে বরকতময় করেছেন।’ সুরা মারিয়াম : ৩১
এখানে বরকতের মূল অর্থ হচ্ছে, আল্লাহর দ্বীনের ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখা। কারও কারও মতে, বরকত অর্থ সম্মান ও প্রতিপত্তিতে বৃদ্ধি। অর্থাৎ আল্লাহ আমার সব বিষয়ে প্রবৃদ্ধি ও সফলতা দিয়েছেন। কারও মতে, বরকত অর্থ মানুষের জন্য কল্যাণকর হওয়া। কেউ কেউ বলেন কল্যাণের শিক্ষক। কারও মতে, সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ।ফাতহুল কাদির
মানুষের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বরকতের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। জীবনে বরকত না থাকলে মানুষের দুশ্চিন্তায় সময় পার করতে হয়, কষ্টের অন্ত থাকে না। এ জন্যই হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সর্বদা নিজের জন্য ও অন্যের জন্য বরকতের দোয়া করতেন। যেমন একদিন সাহাবি হজরত আবদুর রাহমান ইবনে আওফ (রা.)-এর গায়ে (বা পোশাকে) রাসুলুল্লাহ (সা.) হলুদ রঙের চিহ্ন দেখে প্রশ্ন করেন। কী ব্যাপার! তিনি বলেন, আমি এক নারীকে একটি খেজুর আঁটির অনুরূপ পরিমাণ সোনার বিনিময়ে বিয়ে করেছি। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমায় আল্লাহতায়ালা বরকত দিন, অলিমার আয়োজন করো তা একটি ছাগল দিয়ে হলেও। সুনানে তিরমিজি : ১০৯৪
হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) তার প্রিয় দৌহিত্র হজরত হাসান (রা.)-কে বরকত লাভের দোয়া শিক্ষা দিয়েছিলেন। হজরত হাসান (রা.) কর্র্তৃক বিতর নামাজে পঠিত লম্বা দোয়ার অংশ ছিল, ‘ওয়া বারিক লি ফি-মা আ-তাইতা’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! তুমি আমাকে যা দান করেছো, তার মধ্যে বরকত দাও! সুনানে তিরমিজি : ৪৬৪
প্রকৃতপক্ষে বরকত দেওয়ার মালিক দয়াময় আল্লাহ। সৃষ্টিকর্তা আল্লাহতায়ালার কাছ থেকে মানুষ বহুভাবে বরকত লাভ করে। যেমন স্বল্প ও নির্দিষ্ট আয়েও অনেক মানুষ সহজভাবে, স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে জীবনযাপন করে, ভালোভাবে চলাফেলা করে। অনেকে আবার এর চারগুণ আয়েও সেটা পারে না। ইসলামি স্কলারদের মতে এমন কিছু কাজ আছে, যেগুলোর কারণে বরকত কমে, তদ্রুপ এমন কিছু আমল আছে, যার কারণে বরকত বাড়ে।
বরকত নষ্ট হওয়ার কারণ
গোনাহে লিপ্ত থাকলে, প্রতারণা করলে ও ধোঁকা দিলে, কথায় কথায় কসম খেলে, হারাম উপায়ে আয়-উপার্জন করলে, মদপানে, আল্লাহর নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় না করলে, কৃপণতায়, আল্লাহপ্রদত্ত রিজিক ও তাকদিরে সন্তুষ্ট না থাকলে, অপচয়-অপব্যয় করলে, সকালে ঘুমালে, পেটভরে খাবার খেলে, বাম হাতে খাবার খেলে ও পানীয় পান করলে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় না রাখলে, সুদের আদান-প্রদানে, অন্যের আয়-উন্নতি ও বরকত দেখে হিংসা করলে, সঠিকভাবে জাকাত আদায় না করলে এবং সারাক্ষণ সম্পদের চিন্তা ও হিসাবে ব্যস্ত থাকলে।
বরকত বাড়ে যেসব কারণে
ওয়াক্ত মতো ফরজ নামাজ ও নিয়মিত সুন্নত আদায় করলে, কোরআনে কারিমের তেলাওয়াতে, নফল রোজা পালনে, তাহাজ্জুদ নামাজ আদায়ে, তাকওয়া অবলম্বনে, অতিথি আপ্যায়নে, আল্লাহপ্রদত্ত বিভিন্ন নেয়ামতের শোকরিয়া আদায়ে, সর্বোতভাবে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল তথা ভরসা করলে, অল্পে তুষ্ট থাকলে, উত্তম আখলাকের অধিকারী হলে, অপচয়-অপব্যয় না করলে, বেশি বেশি তওবা-ইস্তেগফার করলে, সকাল-বিকেল ও নামাজের পর বরকতের দোয়া পাঠ করলে, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখলে, দান-খয়রাত ও সদকা করলে, মানুষকে করজে হাসানা দিলে, সকালে রিজিকের তালাশ করলে, অভাব-অনটনে আল্লাহমুখী থাকলে, পরিবারের দুর্বল সদস্যের প্রতি সদয় হলে, বিয়ে করলে, সন্তান হলে, কন্যা সন্তানের যথার্থ হক আদায় করলে, বাবা-মায়ের খেদমত করলে এবং এতিমের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিলে।
অনেকে দোয়া করেন হায়াত বাড়ানোর জন্য। বলেন, আল্লাহ তোমার হায়াত বাড়িয়ে দিন। আসলে হায়াত নির্দিষ্ট। আল্লাহতায়ালাই মানুষের হায়াত নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। এর ব্যতিক্রম হওয়ার নয়। এর ব্যাখ্যায় ইসলাম বিশেষজ্ঞরা বলেন, আসলে দোয়ায় হায়াত বাড়ে না, বাড়ে তাতে বরকত। একজন মানুষ তার নির্দিষ্ট হায়াতে স্বাভাবিকভাবে যে পুণ্যকর্ম করতে পারে, এই হায়াতেই তার চেয়ে বেশি পুণ্যকর্ম করতে পারবে, যদি আল্লাহ তাতে বরকত দান করেন। বরকত দানের মালিক যেহেতু আল্লাহ, তাই তার কাছেই সব সৎকাজে বরকত প্রার্থনা করা উচিত।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ঢাকা টেলিগ্রাফ এর দায়ভার নেবে না।