অন্যান্য
দুনিয়ার জীবন তো খেল –তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখেরাতের আবাসই উত্তম; অতএব, তোমারা কি অনুধাবন কর না? [ সূরা আনআম : ২ ]
আল্লাহ তায়ালা পার্থিব জীবনকে খেলাধুলার সাথে তুলনা করেছেন, এই তুলনা দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে দুনিয়ার অস্থায়ী বোঝানো। খেলাধুলা যেমন, এ পার্থিব জীবনও তেমন ক্ষণস্থায়ী। পক্ষান্তরে একমাত্র পরকালই চিরস্থায়ী
এই প্রসঙ্গে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, দুনিয়া হচ্ছে আখিরাতের ক্ষেতস্বরুপ। খেলাধুলার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় সীমা দেয়া থাকে। তেমনই নশ্বর ধরাতে আল্লাহ তা’আলা মানুষকে প্রেরণ করেছেন একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা দিয়ে। এ সময় শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আমাদের সকলকে পরকালীন জীবনে ফিরে যেতে হবে। কাজেই পরকালীন জীবনের কাজই হচ্ছে মূল কাজ। আমরা আজ প্রকৃত দায়ীত্বের কথা না ভেবে হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার লক্ষ্যে তার পিছনে ছুটে চলেছি। আর এ কারণেই আমাদের জীবন খেল-তামাশায় পরিণত হয়েছে। এবার একটু জেনে নিবো বিনোদন কি? এবং ইসলামী শরীয়াহ কোন ধরনের বিনোদন সমর্থন করে। বিনোদন শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হলো – ফুর্তি, আনন্দ, আমোদ, প্রমোদ, উল্লাস, খুশি, আহ্লাদ, অনুরঁজন, চিত্তরঁজন ইত্যাদি।
যে সব ক্রিয়া বা কর্ম মানুষকে আনন্দ দিয়ে থাকে তাই বিনোদন। তবে মানুষ ও তার চিন্তা চেতনা ভেদে আনন্দ ও বিনোদনের বিষয় ভিন্ন ভিন্ন। কেউ কুরআন তিলাওয়াত করে আনন্দ পায়। কেউ গান শোনে আবার কেউ বিকৃত কিছু করে আনন্দ উপভোগ করার চেষ্টা করে। আসলে মানুষের নিজ থেকে আনন্দ ও বিনোদনের উপকরণ ঠিক করে নেয়া অনেক ক্ষেত্রেই অসম্ভব। যে সকল বিনোদন তথা প্রমোদ মানুষকে অশ্লীলতা, বেহায়াপনায়, লজ্জাহীনতা এবং আল্লাহর স্বরন থেকে গাফেল রাখে তাই অশ্লীল বিনোদন।
ইবনে আব্বাস রাদিআল্লাহু তাআ’লা আনহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘অবশ্যই অবশ্যই আমার উম্মতের কিছু সম্প্রদায় রাত্রী অতিবাহিত করবে বিভিন্ন ধরনের খাদ্য-পানীয়তে ভোগ বিলাসী হয়ে এবং বিভিন্ন ধরনের বিনোদন আনন্দ প্রমোদে। এমতাবস্থায় তাদের সকাল হবে শুকুর ও বানরের আকৃতিতে রূপান্তরিত হয়ে।’ [সিলসিলা ছাহীহাহ হা/১৬০৪ , ২৬৯৯]।
অত্র হাদিস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে , এক শ্রেণীর অর্থশালী মানুষেরা নানা ধরনের মদ ও পানীয়ের ব্যবস্থা করে অতি ভোগ-বিলাসে দিনাতিপাত করবে। নানা ধরনের আমোদ-প্রমোদে ও বিনোদনে রাত্রী যাপন করবে। এর মাধ্যম হবে নায়িকান, মদ ও বাদ্য যন্ত্র।
এ ধরণের লোকেরা শুকুর ও বানরে পরিণত হবে। হয় তাদের আকৃতি শুকুর ও বানরের মত হবে, অথবা তাদের হালাল-হারামের বিবেচনা থাকবে না। এজন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে শুকুরের সাথে তুলনা করেছন। তাদের চাল-চলন হবে বিজাতিদের মত অর্থাৎ তাদের স্ত্রী ও মেয়েরা বিজাতিদের মত নানা পোশাক পরবে। আর এদের কাছে যেনা হবে সাধারণ কাজ। এদের বাড়ী-গাড়ি হবে কুকুর ও বিভিন্ন ধরনের মূর্তিতে পরিপূর্ণ। তাই তাদেরকে বানরের সাথে তুলনা করা হয়েছে। কারণ তারা বিজাতিদের অনুকরণ করবে। অপর এক হাদিসে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা’আলা মদ, জুয়া, তবলা ও সারেঙ্গী হারাম করেছেন। তিনি আরও বলেন, নেশাগ্ৰস্ত করে এমন প্রত্যেক বস্তু হারাম। [আহমদ, আবু দাউদ ] এতদ্ভিন্ন বহু প্রমাণ ও নির্ভরযোগ্য হাদিস রয়েছে , যাতে গান-বাদ্য হারাম ও না-জায়েয। বলা হয়েছে , এ ব্যাপারে বিশেষ সতর্কবাণী রয়েছে এবং কঠিন শাস্তির ঘোষণা রয়েছে। সারকথা এই যে, যেসব কাজ প্রকৃতপক্ষে খেলা ; অর্থাৎ যাতে কোন দ্বীনী বা পার্থিব উপকারিতা নেই, সেগুলো অবশ্যই নিন্দনীয় ও মাকরূহ। তবে কতক একেবারে কুফার পর্যন্ত পৌঁছে যায়, কতক প্রকাশ্য হারাম এবং কতক কমপক্ষে মাকরূহ। যেসব কাজ প্রকৃতই খেলা, তার কোনটিই এ বিধানের বাইরে নয়। বর্তমান যুগে অধিকাংশ যুবক-যুবতী অশ্লীল উপন্যাস , পেশাদার অপরাধীদের কাহিনী অথবা অশ্লীল কবিতা পাঠে অভ্যস্ত। এসব বিষয় উপরোক্ত হারাম খেলারই অন্তর্ভুক্ত।
অনুরূপভাবে পথভ্রষ্ট বাতিলপন্থীদের চিন্তাধারা অধ্যায়ন করাও সর্বসাধারণের জন্যে পথভ্রষ্টতার কারণ বিধায় না-জায়েয। তবে গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেমগণ জওয়াবা দানের উদ্দেশ্যে এগুলো পাঠ করলে তাতে আপত্তির কারণ নেই। খেলার সাজ-সরঞ্জাম ক্রয়-বিক্রয়ের বিধান হলো , যেসব সাজ-সরঞ্জাম কুফার অথবা হারাম খেলায় ব্যবহৃত হয়, সেগুলো ক্ৰয়-বিক্রয় করাও হারাম এবং যেগুলো মাকরূহ। খেলায় ব্যবহৃত হয়, সেগুলোর ব্যবসা করাও মাকরূহ। পক্ষান্তরে যেসব সাজ-সরঞ্জাম বৈধ ও ব্যতিক্রমভুক্ত খেলায় ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর ব্যবসাও বৈধ এবং যেগুলো বৈধ ও অবৈধ উভয় প্রকার খেলায় ব্যবহার করা হয়; সেগুলোর ব্যবসাও অবৈধ। এর বাইরে এমনও কতক খেলা রয়েছে যেগুলো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিশেষভাবে নিষিদ্ধ করেছেন, যদিও সেগুলোতে কিছু কিছু উপকারিতা আছে বলেও উল্লেখ করা হয়, যেমন দাবা, চওসর ইত্যাদি। এগুলোর সাথে হারজিত ও টাকা-পয়সার লেনদেন জড়িত থাকলে এগুলো জুয়া ও অকাট্য হারাম। অন্যথায় কেবল চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে খেলা হলেও হাদীসে এসব খেলা নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি চওসর খেলায় প্রবৃত্ত হয়, সে যেন তার হাতকে শূকরের রক্তে রঞ্জিত করে। [ মুসলিম ] এমনিভাবে কবুতর নিয়ে খেলা করাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অবৈধ সাব্যস্ত করেছেন। [আবু দাউদ] এই নিষেধাজ্ঞার বাহ্যিক কারণ এই যে, সাধারণভাবে এসব খেলায় মগ্ন হলে মানুষ জরুরী কাজকর্ম এমন কি সালাত, সাওম ও অন্যান্য ইবাদত থেকেও অসাবধান হয়ে যায়।
তাই সংক্ষেপে এটাই বলা যায় যে, যে খেলায় কোন ধমীয় ও পার্থিব উপকারিতা নেই, সেসব খেলাই নিন্দনীয় ও নিষিদ্ধ। যে খেলা শারীরিক ব্যায়াম তথা স্বাস্থ্য রক্ষার জন্যে অথবা অন্য কোন ধমীয় ও পার্থিব উপকারিতা লাভের জন্যে অথবা কমপক্ষে মানসিক অবসাদ দূর করার জন্যে খেলা হয়, সে খেলা শরীয়ত অনুমোদন করে, যদি তাতে বাড়াবাড়ি না করা এবং এতে ব্যস্ত থাকার কারণে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম বিঘ্নিত না হয়। আর ধর্মীয় প্রয়োজনের নিয়তে খেলা হলে তাতে সওয়াবও আছে। হাদীসে তিনটি খেলাকে নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে তীর নিক্ষেপ, অশ্বারোহণ এবং স্ত্রীর সাথে হাস্যরস করা। আসুন ইসলামের সৌন্দর্য জীবনে অনুসরণ করি। প্রভুর রহমের ছায়াতলে নিজেকে আবৃত করি।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, ঢাকা টেলিগ্রাফ এর দায়ভার নেবে না।